নির্মম পরিণতি

 হিমেল মারুফা গল্প করছে বসে বসে। দুই জনে বেশ ভালো বন্ধু। হিমেল মারুফা ভার্সিটিতে এক নামেই পরিচিত মুখ। কারো সাথে তাদের তেমন শত্রুতা নেই। অন্য ক্লাসমেট বা যেকেনো কেউ বিপদে পড়লে তারা দুজনেই সবার আগে সহযোগিতা করতে এগিয়ে যায়। শিক্ষকদের ও প্রিয়। দারোয়ান চাচা, ফুচকাওয়ালা, টং দোকানের মামা থেকে প্রত্যেকটা মানুষের প্রিয় তাদের ব্ন্ধুত্বসুলভ আচরণের জন্য।………কষ্টের প্রেমের গল্প……….

ভার্সিটি লাইফের তিন বছর শেষ তাদের। বন্ধুত্বের বন্ধন আরো দৃঢ় হয়েছে। মারুফা হিমেল কে বন্ধু থেকে ও বেশি কিছু ভাবা শুরু করে দিয়েছে। ব্যাপারটা হিমেল ও বুঝতে পারছে। কিছুক্ষণ হিমেলের থেকে দূরে থাকলে মারুফার নিজের মধ্যে অস্থিরতা শুরু হয়।

হিমেলের সামনে যতই স্বাভাবিক আচরণ করুক না কেন তার চোখ দেখে হিমেল ঠিকই সব একনিমিষে বুঝতে পারে।

হিমেল ও মারুফার জন্য কিছু একটা অনুভব করে ইদানিং। যেটা আগে হতো না। মারুফার বাসায় হিমেলের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। মারুফার মা তাকে অনেক আদর করত নিজের ছেলের মতো।

আজ ও হিমেল আসলো মারুফার বাসায়। মারুফার মা কে কিছুটা চিন্তিত দেখাচ্ছে। হিমেল কিছু বলার আগেই……………

নাহার বেগম(মারুফার মা): হিমেল বাবা, তোমাকে তো নিজের ছেলের মতোই জানি একটা বিষয় নিয়ে তোমার সাথে আলোচনা করতে চাচ্ছি।তুমি আজকে রাতে খেয়ে যেও।

হিমেল: আচ্ছা আন্টি। হ্যাঁ বলেন…

 নাহার বেগম: মারুফার তো অনার্স শেষ প্রায় কয়েকমাস পর ফাইনাল পরীক্ষা, আমি চাচ্ছি পরীক্ষা শেষ হলেই ওকে বিয়ে দিয়ে দিতে। মারুফাকে কিছু জানাইনি এখনো।

হিমেল:নিশ্চুপ(কি বলবে বুঝতে পারছে না)

নাহার বেগম আবার বলতে শুরু করল ……

………কষ্টের প্রেমের গল্প……

নাহার বেগম: একটা ছেলের কথা বললো আমার ভাই। ছেলে দেখতে শুনতে ভালই। সরকারি কলেজের প্রফেসর। বংশ, টাকা পয়সা, পড়াশোনা সব দিক দিয়েই যথেষ্ট।

হিমেল: তাহলে তো ভালো আন্টি। মারুফাকে জানান । ওর মতামত নিয়েই করুন যা করার। আমি তো আপনাদের পাশেই আছি । (কথা গুলো বলতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল )

নাহার বেগম: হ্যাঁ বাবা, তুমি তো থাকবা তাই তোমাকে জানালাম।

হিমেল: আচ্ছা আন্টি, আসি।

নাহার বেগম: আরে, না খেয়ে কেন যাবা। বস, আমি খাবার দিচ্ছি। মারুফা এই মারুফা, হিমেলকে খাবার বেড়ে দে।

মারুফা: (রুম থেকে বেরিয়ে এলো)। কিরে তুই আসলি কখন। বস খেয়ে নে।

হিমেল: কিছুক্ষণ আগে, আন্টির সাথে গল্প করলাম তাই তোকে ডাকিনি। আজকে না পরে খাব।

মারুফা: বেশি কথা বলিস না, খেয়ে যা ।

হিমেল: যা ভাগ, পড়তে যা। আমার কাজ আছে তাড়াতাড়ি যেতে হবে। নাহার বেগম রান্নাঘর থেকে আসলো।

হিমেল: আন্টি অন্যদিন খাব। আজকে জরুরি কাজ আছে । আসি মিথ্যা কথা বলেই মারুফার বাসা থেকে বেরিয়ে এলো।

তার কোনো কাজ নেই। মারুফার বিয়ের কথা শোনার পর থেকেই তার কিছু ভালো লাগছে না। অজানা ভয়, অস্থিরতা কাজ করছে তার মধ্যে। মারুফার বিয়ে??? অন্যকারো জীবনসঙ্গীনী হবে??? হিমেল থেকে দূরত্ব বেড়ে যাবে???

সব কিছু ভাবতেই চোখ থেকে নিজের অজান্তেই জল গড়িয়ে পড়লো।

………কষ্টের প্রেমের গল্প……

অনেক রাত হয়ে গেছে এখন ও হিমেল রাস্তায় হাঁটছে।কিছুই ভেবে পাচ্ছে না ।মারুফাকে কি বলবে সব???

এরপর যদি আন্টি তাকে ভুল বোঝে এসব জানার পর। নিজের ছেলের মতো জানে তাকে, সবকিছু তাকে আগেই জানায়। মারুফা ও তাকে ভালোবাসে এতটুকু নিশ্চিত হিমেল।

কোনটি করা ন্যায় কোনটা অন্যায় বুঝে উঠতে পারছে না ঠিক। মন চাচ্ছে এই শহর ছেড়ে চলে যায়। দূর থেকেও ভালোবাসা যায়।

কিন্তু মারুফাও তো ভালোবাসে। সে ও কি সুখে থাকবে হিমেল কে ছাড়া। দুই জন অসুখী হলে ছেড়ে না যাওয়াই তো শ্রেয়।

অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলো সে বলবে মারুফাকে এরপর যা হওয়ার হবে। এরপরের দিন ভার্সিটিতে দেখা মারুফার সাথে।হিমেলকে আজকে অন্যরকম লাগছে । সারারাত না ঘুমিয়ে কাটিয়েছে।

মারুফা: কিরে কালকে চলে এলি কেন ? কি এতো তাড়া তোর বউ ডাকছিলো তাই না ………হা  হা হা……….

হিমেল: থাপ্পড় খাবি। আমার কাজ ছিল জরুরি তাই চলে আসছি।

মারুফা: হুম, বুঝলাম।

হিমেল: আচ্ছা শোন না,তোকে একটা কথা বলার ছিল। ওইদিকে চল , বসি একটু।

মারুফা: হুম চল।

দুইজনে গাছের নিচে বসলো। এখানে তারা প্রায় বসে গল্প করে।

মারুফা: বল কি বলবি।

হিমেল: আমি তোকে ছাড়া থাকতে পারব না। প্লিজ কখনো ছেড়ে চলে যাইস না।

মারুফা: কি আবোল তাবোল বলছস। ছেড়ে যাব কেন। আমি সবসময় তোর পাশে আছি।

হিমেল: আমি তোকে ভালবাসি।

মারুফা: (লজ্জাই লাল হয়ে যাচ্ছে, হিমেলের দিকে তাকাতে পারছে না)

হিমেল: কিছু বল। ভালোবাসিস?

মারুফা: হুম।(আস্তে করে বলল)

হিমেল: না বাসলে বলতে পারিস। তোর মতামত জানালেই হবে। আমার জন্য ভাবিস না কিছু। যেটা সত্যি সেটাই বল।

মারুফা: হুম অনেক ভালোবাসি।

………কষ্টের প্রেমের গল্প……

দুইজন হাত ধরে অনেকক্ষণ হাঁটলো। অনেক গল্প করলো। আজকে অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে। সময় প্রায় শেষ। মারুফাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে হিমেল ও বাসায় চলে গেল।

নাহার বেগম মারুফাকে বিয়ের কথা জানালে সে এখন বিয়ে করবে না বলে জানিয়ে দেয়। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর এ নিয়ে ভাববে। নাহার বেগম ও আর বেশিকিছু বলেনি।মেয়ের মতামত মেনে নিয়েছেন।

একসাথে ঘোরাঘুরি , প্রচুর গল্প করা এসবের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে দিন। হিমেল কিভাবে যেন একদিন জানতে পারে মারুফার কলেজ লাইফে ২ বছরের একটা রিলেশন ছিল। যেটা সম্পর্কে হিমেল কে কিছুই বলেনি মারুফা। কেন লুকিয়েছে সেটাই বুঝতেছে না হিমেল। সবই তো হিমেল কে বলে।

মারুফাকে জিজ্ঞেস করল। মারুফা ঘাবড়ে গেল। হঠাৎ এসব কার থেকে শুনলো। এই কথাটাই শুধু বলা হয়নি হিমেল কে। তার জীবনের ভয়ংকর কালো অধ্যায় তার এই অতীত।

স্বীকার করলো মারুফা সব হিমেলের কাছে। মারুফার কালো অতীতের সব বললো। তার সাথে কি কি হয়েছিলো ওইদিন। সাজিদের সাথে প্রথম দেখা ছিল। মিথ্যে কথা বলে সাজিদ তাকে সাজিদের বাসায় নিয়ে যায়। এরপরের নোংরা কাহিনী আর বলতে পারছে না মারুফা। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে অনবরত। আর কিছুই শুনতে ইচ্ছে করছে না হিমেলের। মারুফাকে ওইখানে রেখে চলে আসছে।

মারুফা বাসায় যেয়ে কল দিয়েই যাচ্ছে । এরপর কয়েকটা মেসেজ করলো হিমেল কে। সে চাইনি হিমেল কে হারাতে তার ভয় কাজ করতো সব শোনার পর যদি হিমেল তাকে ছেড়ে চলে যায়। তাই বলতে চেয়েও বারবার বলতে পারে নি।

হিমেল মানতে পারছেনা এত বড় সত্যি মারুফা লুকালো। কেন এমন করলো। এরকম কেনই বা তার সাথে হলো। ভালোবাসার মানুষটি তাকে ধোঁকা দিয়েছে ‌। বারবার মাথায় এটাই ঘূরপাক খাচ্ছে। মারুফার সাথে আর কথা বলেনি।

আজকে এক সপ্তাহ হয়ে গেল। বাসা থেকেও বের হয়নি। মারুফা পাগলের মত হয়ে গেছে এই কয়দিনে। হিমেল চলে গেছে মানতে পারছে না। নিজেকে দোষী মনে হচ্ছে। কেন সত্যি টা লুকোলো। হিমেলের কাছে দাঁড়িয়ে কথা বলার সব অধিকার শেষ।

তাদের কত সুন্দর রিলেশন টা শেষ হয়ে গেল। যে ভয় থেকে লুকিয়েছে সেটাই সত্যি হয়ে গেল। কয়েকমাস হয়ে গেল হিমেলের সাথে যোগাযোগ নেই।

আজকে হিমেল থাকলে অনেক আনন্দ হতো। ১বছর পূর্ণ হয়েছে তাদের রিলেশনের। খুব বেশি মনে পড়ছে আজ হিমেল কে। নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না পাগলের মত কাঁদছে।

নতুন আইডি খুলে হিমেল কে একটা ভয়েস মেসেজ পাঠালো। এরপরেই ফোন টা অফ করে দিল। হিমেল মেসেজ দেখলো। তার মারুফার কন্ঠ এটা।

ভয়েসটি ছিলো এরকম————- তোমাকে অনেক ভালোবাসি। নিজের থেকেও বেশি। তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না কখনো। আমি জানি আমি দোষী।যা ক্ষমার যোগ্য নয় তাই তো চলে গেছ তুমি। অনেক বেশি ভালোবাসি তোমায়।যদি সম্ভব হয় মাফ করে দিও।

এসব শুনে হিমেল ও কাঁদছে। সাথে সাথে কল দিল । কিন্তু ফোন অফ। ভোর হওয়ার আগেই সে মারুফার বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। আবার আগের মত হয়ে যাবে তারা। এই কয়েকমাস সে ও তো ভালো ছিলো না মারুফাকে ছাড়া।

মারুফাদের বাড়িতে গিয়ে দেখলো মানুষের ভিড় অনেক। থমথমে অবস্থা। সবাই তার দিকে অন্যরকম ভাবে তাকাচ্ছে। সবার চাহনি তে মনে হচ্ছে হিমেল দোষী। কি হলো কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।

সামনে এগিয়ে যেয়ে দেখলো সাদা কাফনে মোড়ানো লাশ। সেটা মারুফা ছাড়া আর কেউ নই তা বুঝতে বাকি রইলো না তার।পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হিমেল। মারুফাকে দাফন করে আসলো। নাহার বেগম তার সাথে একটি কথাও বলেনি। যার জন্য তার মেয়ে আজ না ফেরার দেশে কি বা বলার আছে তাকে আর। হিমেল চলে আসলো সেখান থেকে। সব জায়গাতেই তো মারুফার স্মৃতি। মনে হচ্ছে মারুফা জীবন্ত।

হিমেল ও মারুফার মত ছোট ছোট ভুলের জন্য ঠিক এই ভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে হাজারো ভালোবাসা………



Comments