নীল পাথরের ব্রেসলেট

 প্রবল ঝড়বৃষ্টিতে পৃথিবী কাঁপিয়ে বিদ্যুৎ চমকাতে আচমকা জ্বিহাদকে কেউ পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। মুহূর্তে পা থেমে গেল তার। এতটা চমকে গেল যে বজ্রপাতের গগনবিদারী চিৎকারের ছিঁটেফোঁটা অংশ কানে ঢুকলো না। ক্রমেই৷ পেছন থেকে মেয়েলি স্পর্শটা আরো গভীর ভাবে আঁকড়ে ধরছে তাকে। উষ্ণ স্পর্শ! বুকের কাছে পেঁচিয়ে রাখা হাতদুটো সে ভয়ে ভয়ে স্পর্শ করলো। সঙ্গে সঙ্গে নরম একজোড়া হাত তাকে ছেড়ে দিল। জ্বিহাদ দ্রুত পেছন ঘুরে কম্পিত কন্ঠে প্রশ্ন করলো,

'কে?'
অন্ধকারে অস্পষ্ট নারীমূর্তি আবিষ্কার করলো সে। নারীমূর্তির মুখোচ্ছবি দেখা যাচ্ছে না। তবে শীতে যে ঠকঠক করে কাঁপছে সেটা বুঝতে অসুবিধা হলো না।
নিজের ভেতর কেমন চঞ্চলতা অনুভব করলো জ্বিহাদ। গ্রামের মাটির কাঁচা রাস্তা। দুধারে ইউক্যালিপটাস গাছের সারি। সবুজ খেত। আকাশ থেকে ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়ছে। থেকে থেকে দমকা হাওয়া বইছে। কখনো বা বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। এমন একটা পরিবেশে কোনো মেয়ে তার সঙ্গী হয়েছে দেখে ভেতরে ভেতরে রোমাঞ্চকর অনুভূতি হলো। সে মৃদু সুর তুলে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আবার প্রশ্ন করলো,
'কে তুমি? কোথায় যাচ্ছো?'
মেয়েটি এবার মুখ খুলল। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
'আর একটু সামনে আমার বাড়ি। স্কুলে পড়তে গিয়েছিলাম আমি। স্কুল শেষে কোচিং করেছি। ফেরার পথে বৃষ্টি জেঁকে ধরলো। আমায় একটু আপনার সাথে নিবেন? বজ্রপাত ভীষণ ভয় পাই আমি!'
কি স্নিগ্ধ কন্ঠ! জ্বিহাদের শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন সুরের ঝংকার তুলল। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো তার। এই বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় তার মনের শহরে অন্য রকমের দোলা দিয়ে গেল। কলেজ জীবন থেকে যান্ত্রিক শহরে মেসে থেকে পড়ালেখা করে সে। অল্প কয়েকদিনের জন্য ইদের ছুটি পেয়েছে। গ্রামে ফেরার কোনো ইচ্ছে তার ছিল না। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মায়ের কান্নারত মুখ সহ্য করতে না পেরে আজ রওনা দিয়েছে। স্টেশন পেরিয়ে বড় বাজার আসার পথে বৃষ্টির মুখোমুখি হয়। বহু দিন এমন বৃষ্টিতে ভেজা হয় না। সেজন্য লোভ সামলাতে না পেরে ভিজেই রওনা দিয়েছে। কিন্তু কিছুদূর আসার পরে যখন চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে এলো তখন তার সিদ্ধান্তে কিছুটা মন খারাপ হয়েছিল। কিন্তু এই যে নির্জন, সুনশান রাস্তায় মেয়েটিকে সঙ্গী পেয়ে তার বুকের ভেতর আলাদা ভালো লাগার সৃষ্টি হলো।
সে মেয়েটিকে অভয় দিয়ে বলল,
'ভয় পেয়ো না। আমার সাথেই ফিরবে তুমি! কোন ক্লাসে পড়ো তুমি?'
'ক্লাস টেন!'
'এত পিচ্চি তুমি? আমি শহরের ভার্সিটিতে পড়ি!'
মেয়েটি এবার মাথা তুলে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের দক্ষিণ কোণ ঘেঁষে আকাশে বিদ্যুৎ চমকে উঠলো। তার কমলা-লাল আলো এসে মেয়েটির মুখে আছড়ে পড়লো। জ্বিহাদ ধুকপুক করা বুক নিয়ে আবিষ্কার করলো অপরূপ সৌন্দর্য্যের অধিকারিণী একটি মেয়ে। চোখের পলক ফেলে দেখার আগেই চারপাশ অন্ধকারে ছেঁয়ে গেল। সেই সাথে মেয়েটি দ্বিতীয় বারের মতো তাকে ঝাপটে ধরলো।
জ্বিহাদের ভেজা জবজবে শীতল শরীরটা কোমল উষ্ণতায় ভরে গেল। বুকের বা পাশটায় হাতুড়ি পেটার শব্দ হলো। এবারও বজ্রপাতের শব্দ তার কর্ণকূহরে প্রবেশ করলো না। মনের পর্দায় আঁটসাঁট হয়ে একটা ছবি গেঁথে গেল। কিশোরী একটা মেয়ে। নীল রঙা স্কুল ড্রেস, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, ভেজা চোখের পাপড়ি, খাড়া নাক, কম্পমান রক্তিম ঠোঁটযুগল আর ভয়ার্ত এক জোড়া চোখ। আনমনে হাতটা মেয়েটির পিঠে চলে গেল। মেয়েটিকে আশ্যস্ত করে বলল,
'ভয় নেই তোমার। আমি আছি!'
তার কন্ঠ কানে যেতে দ্রুত মেয়েটি তাকে ছেড়ে দিল। ইতোমধ্যে বৃষ্টির বেগ বেড়ে গেছে। তাড়াতাড়ি করে বাড়ি পৌঁছাতে হবে। দিনের কিছু অংশ বাকি থাকলেও অন্ধকার দেখে বোঝার উপায় নেই। সে এক পা এগিয়ে মেয়েটিকে বলল,
'চলো হাঁটি! বৃষ্টি বেড়ে যাচ্ছে। তোমার ঠান্ডা লেগে যাবে।'
'আমার ঠান্ডা লাগে না। কিছুই হয় না আমার। শুধু বজ্রপাত ভীষণ ভয় পাই।'
মেয়েটি নিঃশব্দে আবার হাঁটা ধরলো। জ্বিহাদ তার পাশাপাশি হাঁটলেও তার দৃষ্টি মেয়েটির উপর নিবদ্ধ রইলো প্রতিটা সময়। কিছুদূর যেতে সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
'তুমি কি এখনো ভয় পাচ্ছো?'
'হুঁ! বললাম না? আমি বৃষ্টি, বজ্রপাত ভীষণ ভয় পাই। ওরা আমার জীবন কেড়ে নিয়েছে। আমি বজ্রপাত ভীষণ ভয় পাই।'
শেষের কথাগুলো জ্বিহাদের কানে ঠিক মতো পৌঁছাল না। সে নিজে থেকে মেয়েটির হাত চেপে ধরলো। মেয়েটি কোনো প্রতিক্রিয়া করলো না। মিনিট দেড়েক পরেই সে চিন্তিত কন্ঠে বলল,
'তোমার হাত এত শীতল কেন? একদম ফ্রিজড হয়ে গেছে।'
মেয়েটি মাথা নিচু করে হাঁটছে। জ্বিহাদ অন্ধকারে তার মুখ দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু সে খুব করে চাচ্ছে আরেক বার বজ্রপাত হোক। এই সদ্য ফোঁটা ফুল তাকে জড়িয়ে ধরুক। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস আরেক বার তার বুকে আছড়ে পড়ুক। আরেক বার সে ওই ভীত চাহনিরত চোখ জোড়া দেখতে চায়। সে পুনরায় বলল,
'তোমার হাত এত ঠান্ডা হয়েছে কেন?'
'জানি না!'
'তোমার কি শীত লাগছে?'
মেয়েটি পূর্বের ন্যায় মাথা নিচু করে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
'জানি না! কিছুই জানি না আমি!'
এবারে কিছুটা ভয় পেয়ে গেল জ্বিহাদ। মনে হলো মেয়েটির কন্ঠ বৃষ্টির ফোঁটার মতোই তীক্ষ্ণ আর হিমশীতল। গায়ে কাঁটা দিয়ে যাচ্ছে। ভয়ে কি না জানা নেই, সে মেয়েটির হাত ছাড়তে চাইলো। কিন্তু বিস্ময় নিয়ে লক্ষ্য করলো, সে মেয়েটির হাত থেকে নিজের হাত আলগা করতে পারছে না। মেয়েটিও তার আঙুল আঁকড়ে নেই। অদৃশ্য কোনো শক্তি যেন দুজনের হাত একত্রে করে রেখেছে। শুকনো ঢোক গিলল সে। নিজেকে শক্ত করে বলল,
'একই গ্রামে আমাদের দুজনের বাড়ি। কিন্তু তোমায় তো চিনি না। তোমার নাম কি?'
মেয়েটি বরাবরের মতো প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল। নিজের হাতে একপ্রকার টান অনুভব করলো জ্বিহাদ। দেখলো মেয়েটা খুব দ্রুত হাঁটছে। তার পায়ের সাথে তাল মেলাতে পারছে না সে। খুব কষ্ট হচ্ছে হাঁটতে তার। মেয়েটির হাত ক্রমেই বরফ শীতলতাকে হার মানাচ্ছে। সে এত ঠান্ডা সহ্য করতে পারছে না। তার নিজের শরীর ঠকঠক করে কাঁপছে। দাঁতে দাঁতে বাড়ি খাচ্ছে। সে কম্পিত কন্ঠে বলল,
'কে তুমি মেয়ে? তোমার নাম কি? আচ্ছা, তোমার নাম বলতে হবে না। তোমার বাবার নাম কি? তোমার বাবার নাম বললেই চিনবো আমি।'
উত্তর পেল না সে। তবে হুট করে মেয়েটির হাত ধরে রাখা হাতে তীব্র টান অনুভব করলো। চোখ বন্ধ হয়ে এলো তার। মাথায় চক্কর দিয়ে উঠলো। প্রচন্ড জোরে একটা হাওয়া এসে তাকে যেন উড়িয়ে নিয়ে গেল। অথই সমুদ্রে ভাসমান এক টুকরো খড়কুটো হিসেবে সে মেয়েটির হাত শক্ত হাতে চেপে ধরলো।
খুব দ্রুত হাওয়া থেমে গেল যেন। জ্বিহাদ চোখ খুলে দেখলো সেই আগের মতো মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির ফোঁটা সুতীক্ষ্ম ফলার মতো গায়ে বিঁধছে। ডান হাত হালকা মনে হতে সে দেখলো, হাত খালি। চমকে আশপাশে তাকালো। মেয়েটি কোথাও নেই। বুকের ভেতর শীতল রক্তস্রোত বয়ে গেল। সে ভয়ার্ত চোখে চারপাশে লক্ষ্য করে দেখলো বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে প্রায়। আর মিনিট দশেক হাঁটলে পৌঁছে যাবে। কিন্তু সে এতদূর এলো কিভাবে?
ডানপাশে লক্ষ্য করলো সে। রাস্তার পাশ ঘেঁষে সুবিশাল বটগাছ টা আগের মতোই আছে।ঝড়ো বাতাসে তার বড় বড় পাতা দোল খাচ্ছে। বটগাছের ওপাশে বড় ঈদগাহ মাঠ। মাঠের দক্ষিণ দিকে ইট সিমেন্টে ঢালাই করা বসবার জায়গাটা এখান থেকে চকচক করছে। একবারের জন্য মনে হলো সেখানে কে যেন বসে আছে। কিন্তু ঝড়-বৃষ্টিতে ওখানে কে বসে থাকবে? পরক্ষণে তার মেয়েটির কথা মনে পড়লো। চারপাশে নজর বুলিয়ে ব্যর্থ হলো। কোথাও জন মানবের চিহ্ন নেই। ভয়ে জ্বিহাদ দ্রুত বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিল।
কয়েক পা এগুতে শরীর জমে গেল তার। পা মাটি থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করলো। কিন্তু পারছে না। বটগাছের মতো শিকড় গজিয়ে গেছে যেন। বুকের ভেতরটা অজানা আতংকে কেঁপে উঠলো তার। ভয়ে গলা শুকিয়ে এলো। চারিদিকে কেমন গা ছমছমে ভাব। হুট করে মনে হলো বটগাছের পাতা হাসছে। তার দিকে তাকিয়ে আছে। আশপাশের প্রকৃতি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তার বাম পাশের খালের কিনার ঘেঁষে থাকা ঝাউবনের সারি যেন তার দিকে এগিয়ে আসছে। বটগাছ তার দিকে এগিয়ে আসছে। চারপাশের সমস্ত গাছপালা ছুটে আসছে তার দিকে!
বিস্ফারিত নয়নে মাথা ঘুরিয়ে ঈদগাহ মাঠের দিকে তাকালো সে। মাঠের মাঝে আগুন জ্বলছে। আগুনের উপর বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। কিন্তু কি আশ্চর্য! আগুন নিভছে না। আগুন থেকে বেশ খানিকটা দূরে নীল রঙা ড্রেস পরিহিত সেই মেয়েটি নির্বিকার ভাবে বসে আছে। আগুনের লালচে আভায় দেখতে পেল মেয়েটির ঠোঁট জোড়া তিরতির করে কাঁপছে। মেয়েটির কপাল বেঁয়ে সরু একটা রক্তের ধারা। ভয়ার্ত চোখে মেয়েটি ডান হাত দিয়ে রক্ত ছুঁয়ে দেখছে। তার হাতের কবজিতে থাকা নীল পাথরের ব্রেসলেটে আগুনের আলো পড়ে চকচক করছে।
হুট করেই মেয়েটির সৌন্দর্য ঢাকা পড়ে গেল। বীভৎস কদাকার এক রূপে পরিবর্তিত হলো সে। জ্বিহাদ ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলো। পা টেনে এগিয়ে যেতে কাঁদা মাটিতে পড়ে গেল। গা কাঁদায় মাখামাখি হয়ে গেল। তবুও সে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করে এগিয়ে যেতে লাগলো। হঠাৎ চোখের সামনে নীল পাথরের ব্রেসলেট পরিহিত একটা কাটা হাত ভেসে উঠলো। ভয়ার্ত চোখে তাকাতে হাতটি তাকে টেনে তুলল। জ্বিহাদ গোঙানির মতো আওয়াজ করে সামনে তাকালো। দেখলো সেই নারীমূর্তি! মেয়েটির থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। বিনিময়ে মেয়েটির হাতের ব্রেসলেট ছিঁড়ে তার হাতে চলে এলো। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম কোণ ঘেঁষে বিদ্যুৎ চমকালো। সেই আলোতে চোখের সামনে দৃশ্যমান হলো তার দেখা সবচেয়ে ভয়ংকর কদাকার মুখের এক নারীমূর্তি। মুহূর্তে তীব্র আর্তচিৎকার দিয়ে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।
_____________
গভীর রাত। টিনের চালে ঝমঝম করে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার শব্দ হচ্ছে। থেকে থেকে বাতাসের সাথে বৃষ্টির ছিঁটে এসে ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে জ্বিহাদকে। সে দাঁড়িয়ে আছে তার রুমের জানালা ঘেঁষে। তার দৃষ্টি ডান হাতের তালুতে নিবদ্ধ। হাতের তালুতে মুষ্টিবদ্ধ করে রাখা নীল পাথরের ব্রেসলেটের দিকে। সে অপেক্ষায় রয়েছে প্রবল ধারার বৃষ্টির। কিছুক্ষণ পর ঝড়ো হাওয়ার সাথে সাথে বৃষ্টির বেগ বেড়ে যেতে সে রুমের দরজা খুলে বের হলো। মায়ের ঘরের দিকে এক পলক চেয়ে বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে চলল ঈদগাহ মাঠের দিকে। সেখানে তার জন্য কিশোরী একটা মেয়ে অপেক্ষা করছে। মেয়েটির কাছে পৌঁছাতে হবে। বৃষ্টি এলেই মেয়েটি তাকে করুণ সুরে ডাকে! তাকে আজও ডাকছে!
*সমাপ্ত *

Comments