নতুন_জীবন

 




-তান! -হুঁ

-কি করো?

-খাচ্ছি। -কি খাচ্ছ?

-তরকারি।

-তরকারি?

সকাল সকাল তরকারি খাচ্ছ যে?

-গতকালকের তরকারি গুলো একটু টকে গেছে,ফেলতে ইচ্ছে করছে না।তাই খাচ্ছি।

-তোমাকে না কতবার বারন করেছি টকে যাওয়া তরকি খাবে না।পরে গ্যাস্ট্রিক বেড়ে যাবে।

-কিচ্ছু হবে না, এখনও তো ঠিক আছি।

-তান! -হু

-টাকা পাঠাবো?

মাত্র এক হাজার। প্লিজ না করো না।

-উহু,কাল পরশু টিউশনির টাকা পেয়ে যাবো।

-এমন কেনো তুমি?

-কেমন আমি?

আমি তো আমার মতো।

-খাওয়া শেষ?

-নাহ,খানিকটা বাকি আছে।

-আচ্ছা খেয়ে নাও, পরে ফোন দিচ্ছি।

কথাটা বলেই ফোন রেখে দিলাম।আসলে আরো কিছুক্ষণ কথা বলার ইচ্ছে ছিলো কিন্তু মনটা খারাপ হয়ে যাওয়ায় আর কথা বাড়ালাম না।

যে মেয়েটার সাথে এতক্ষণ কথা বলছিলাম, ওর ভালো নাম তানমীম ঐশী, আমি ওকে তান বলেই ডাকি। ওর মতো মেয়ে আমি খুব একটা দেখিনি কখনও। একদম অন্যরকম। এতো শক্ত ব্যাক্তিত্বের কেবল মেয়ে নয় মানুষই আমি খুব কম দেখেছি।

তান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ইকোনোমিক্স নিয়ে। বলতে গেলে মধ্যবিত্ত পরিবারেরই মেয়ে ও। দেখতে খুব আহামরি সুন্দরীও না। তবুও ওকে আমার কেন যেন মনের অজান্তে ভালো লেগে গেছে। কেনো ভালো লেগেছে আমি জানি না, হয়ত তার শক্তপোক্ত ব্যাক্তিত্বের জন্যই।

আজ থেকে দুবছর আগে একটা রেস্টুরেন্টে ওর সাথে প্রথম দেখা হয় আমার। আমার বন্ধু সিফাতের সেদিন বার্থডে ছিলো। ও বার্থডে সেলিব্রেট করলো বসুন্ধরাতে।

আমরা বন্ধুরা সবাই গেলাম। সিফাতের সুন্দরী গার্লফ্রেন্ড আসলো তার কয়েকজন ক্লোজ ফ্রেন্ডকে নিয়ে। যথারীতি কেক কাটা হলো, আমরা সবাই অনেক মজা করলাম।

এবার সিফাত এসে বললো এই তোরা কি খাবি অর্ডার কর। চিকেন ফ্রাই, পাকিস্তানি বোকব্যান ফ্রাই আর চিচপুরাৎ(মায়ানমারের এক ধরনের কাবাব) অর্ডার করলাম।

আমরা বেশ হুল্লোড় করেই খাচ্ছি, হঠাৎ বাঁ দিকে চোখ যেতেই দেখি একটা মেয়ে কাঁটা চামচ দিয়ে বার বার বোকব্যান খাওয়ার ট্রাই করছে কিন্তু পারছে না। তাই সে হাত দিয়ে খাওয়া শুরু করলো। আমি নকিবকে বললাম দেখ দোস্ত মেয়েটা কি করছে।

নকিব ব্যাপারটা দেখে খুব জোরে জোরে হাসতে লাগলো। ওর হাসি দেখে আমিও আর হাসি আটকাতে পারলাম না।আমিও হেসে উঠলাম।

নকিব এবার মেয়েটার কাছে গিয়ে বললো ম্যাডাম এটা এভাবে খায় না। মেয়েটা খুব লজ্জা পেলো। আমরা তখনও হাসছিলাম। আমাদের দেখাদেখি এবার সবাই হাসাহাসি শুরু করলো। মেয়েটা এবার কান্না করে দিলো।

এবার সিফাতের গার্লফ্রেন্ড খুব রেগে গিয়ে বললো, সিফাত এসব কি হচ্ছে? তোমার বন্ধুরা আমার বান্ধুবিকে এভাবে অপমান করছে আর তুমি কিছু বলছো না? এরপর আমাদের দিকে অগ্নিশর্মা হয়ে তাকিয়ে বললো ছিঃ।

সিফাতের গার্লফ্রেন্ড তার বান্ধুবিদের নিয়ে গটমট করে চলে গেলো। যাওয়ার আগে সেই মেয়েটি কান্না জড়িত কন্ঠে বললো, আমি এ খাবার আগে কখনও খাই নি। তাই জানি না কি করে খেতে হয়। আমার খুব খারাপ লেগেছিলো কথাটা শুনে।

দুই দিন পর, সিফাতের বান্ধুবির কাছ থেকে ওই মেয়ের ঠিকানা নিয়ে আমি তার কাছে গেলাম ক্ষমা চাইতে, মেয়েটা আমাকে নির্দিধায় ক্ষমা করে দিলো। আমি বেশ অবাক হলাম সেদিন।

রাগের কিংবা ঘৃনার কোনো চিহ্ন মাত্র ছিলোনা তার চেহারায়। আর সেদিনই মেয়েটাকে আমার ভীষন ভালো লেগে যায়।

আমি আইয়ান মুহাম্মদ, সবাই অবশ্য শূদ্ধ বলে ডাকে। এতক্ষণ যে মেয়েটার কথা বলছিলাম, এই মেয়েটা আমার ভালোবাসা। এখন আমি মেয়েটাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি রোজ। ওর ব্যক্তিত্বের কাছে আমি হার মেনে যাই কতশতবার। ওকে কখনও কোনো দামি গিফ্ট দিতে পারতাম না, ও রেগে যেতো খুব। ওকে দামি রেস্টুরেন্ট এ নিতে পারি নি আজ অবদি। ও আমাকে বদলে দিয়েছে এবং বেশ ভালোভাবেই বদলে দিয়েছে।

আমার বাবার কোটি কোটি টাকা, হাত বাড়ালেই মুঠো ভরে টাকা পাই আমি। যা ইচ্ছা তা করতে পারি। কিন্তু এসবে জীবনটাকে বেশ একঘেয়ে আর পানসে লাগতো খুব। কিন্তু তানের সাথে চলতে গিয়ে দেখলাম। জীবনটা আসলেই অনেক সুন্দর। জীবনের প্রত্যেকটা বাঁকে কত রং, কত আনন্দ।

তানকে যদি বলি তান চলো আমারা কোথাও ঘুরতে যাই আজ। ও বলবে চলো আজ নদীর পাড়ে হাটবো আমরা, তবে হ্যাঁ, তুমি কিন্তু গাড়ি নিয়ে আসতে পারবে না, আমরা রিকশায় চড়বো আজ।

আরেকদিন ওকে বললাম চলো বসুন্ধরায় যাই, অনেকদিন চিচপুরাৎ খাই না আজ খাবো। ও বললো,চলো রামপুরায় যাই ওখানকার ফুচকা গুলো যা মজা তুমি না খেলে বুঝতে পারবে না।

আমি ওকে বললাম যে ফুচকা খেলে কি পেট ভরবে?

ও বললো ওই বড় বড় রেস্টুরেন্ট এর দামি দামি খবার গুলোয় পেট ভরে ঠিকই কিন্তু মন ভরে না। ওর যুক্তিতে হেরে যেতাম আমি সবসময়।

রাস্তার পাশে বসে কখনও ভেলপুরি আর ডালভাজা খাওয়া হয়নি আমার। তানের সাথে এখন আমি প্রায়ই রাস্তার পাশে বসে এসব খাই। অন্যরকম একটা তৃপ্তি আছে এসবে। আসলেই এই খাবার গুলো খেলে পেট নয় কেবল মনও ভরে যায়।

তান আমাকে একটা নতুন জীবনে নিয়ে এসেছে। এ জীবনটা খারাপ না। বরং আগেরটার চাইতে ভালো। আমি এখন অন্য আমি হয়ে অন্য জীবন অতিবাহিত করি। বন্ধুরা অনেকে দেখে হাসে আবার অনেকেই অবাক হয়। আমি এসবকে পাত্তা দেই না। আমার সাথে তান আছে যে।



Comments