নীল কষ্টের কাব্য
'মেঘা, তুমি লন্ডনে যাবে ভালো কথা!যাওয়ার আগে আমায় শক্ত করে একবার জড়িয়ে ধরো তো!'
সুবিশাল থাই গ্লাসের ভেতর দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে মেঘা।স্বচ্ছ কাচের ওপাশে পেজা তুলোর মতো তুষার ঝরে পড়ছে।এই তুষারের দিকে চেয়ে ভোরবেলাতে তার আকাশের এই কথাটি বার বার কানে বাজছে।আকাশের সাথে কাটানো মুহূর্ত গুলোর কথা মনে পড়ছে।মনে পড়ছে আজ থেকে দেড় বছর আগের কথা।
আকাশের সাথে তার চার বছরের প্রেমের সম্পর্ক।তার যখন উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডনে আসার কাগজাদি ঠিক হয়ে যায় তখন সে মুষড়ে পরে!আকাশকে ছাড়া কি করে থাকবে!আকাশই বা তাকে বাইরে যেতে দিবে কি না ইত্যাদি নানা টেনশন।অথচ সে লন্ডনের ভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে শুনে তার চেয়ে বেশি খুশি আকাশ হলো।পরম উৎসাহ নিয়ে তার প্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিস কিনে দিল।তার গোছগাছের ব্যাপারে তুমুল আগ্রহ দেখাল।
আকাশের এত স্বাভাবিকতা সে সহ্য করতে পারলো না।কান্নাকাটি করতে করতে অবস্থা খারাপ করে ফেলল।শেষ মুহূর্তে এসে মনে হলো তার উচ্চ ডিগ্রি চাই না,তার চাই আকাশকে।আকাশকে না দেখলে সে মরে যাবে।তাকে রেখে এত দূরে সে থাকতে পারবে না। কিছুতেই না!কিন্তু তার এসব ভাবনা আকাশের কাছে পাত্তা পেল না।আকাশ আগের মতোই সাগ্রহে, হাসতে হাসতে ব্যাগপত্র রেডি করে দিলো।
পরের দিন রাত বারোটায় মেঘার লন্ডনের ফ্লাইট। আগের রাতে আকাশ এলো তাদের বাড়িতে।তার আর আকাশের সম্পর্কের ব্যাপারে সবাই জানে।তাই কেউ আর বাঁধা দিল না।সে রাতে ছাদে দাঁড়িয়ে মেঘা কেঁদে বুক ভাসাল।আকাশের সামনে হাঁটু ভাঁজ করে বসে বলল,
'আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না।তোমাকে না দেখলে আমি মরে যাব।'
আকাশ পুরনো সেই ভুবন ভুলানো হাসি দিয়ে উত্তর দিল,
'আরে ধুর পাগলি।কাউকে না দেখতে পেয়ে কেউ মরে যায় না।শুধু ক্ষণিকের কষ্ট হয়।একদিন সব ঠিক হয়ে যায়।সময়ের ব্যাপার মাত্র!'
'তুমি নীতিবাক্য বন্ধ করো। এখনো সময় আছে আকাশ।প্লিজ কিছু একটা ব্যবস্থা করো যাতে আমার লন্ডন যাওয়া ক্যান্সেল হয়ে যায়।'
'যা কিছু হয়ে যাক না কেন, তুমি লন্ডন যাচ্ছো!'
'তুমি কি সত্যিই চাও আমাকে দূরে রাখতে?'
আকাশ নিচু হয়ে তার বাম হাতটা দু হাতের মুঠোয় পুড়ে নিল। হাতের উল্টো পিঠে ছোট ছোট চুমুতে ভরিয়ে দিল। একটুপর কন্ঠে বিষণ্ণতা নিবেদন করে বলল,
'হ্যাঁ, চাই মেঘ!আমার কি কম সৌভাগ্য বলো?থার্ড ডিভিশনে গ্রাডুয়েশন কমপ্লিট করা ছেলের পিএইচডি ধারী বউ।এটা কি তোমার কাছে কম মনে হয়?আমি যখন বুক উঁচিয়ে মানুষকে বলবো আমার বউ ডক্টরেট!তাতে আমার কতটা ভালো লাগবে তুমি বুঝো না?'
মেঘা আবার কান্না শুরু করলো। আবছা অন্ধকারে আকাশের মুখপানে অপলক চেয়ে রইলো। একটুপর মাথা নিচু করতে আকাশ তার দু কাঁধে হাত রেখে বসা থেকে দাঁড় করাল।মেঘার মুখটা উঁচু করে অনুযোগের সুরে বললো,
'মেঘা!তুমি লন্ডন যাবে ভালো কথা।লন্ডন যাওয়ার আগে আমায় শক্ত করে একবার জড়িয়ে ধরো তো!'
সে রাতে আকাশের কথা শেষ হতে না হতে সে আকাশের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।ঘন্টা দুই শুধু জড়িয়ে ধরেই সে ক্ষান্ত হয়নি।আকাশকে এলোপাথাড়ি চুমুও খেয়েছিল।
দেড় বছর আগের চুমুর কথা মন পরতে মেঘার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল।কান রীতিমতো ঝাঁ ঝাঁ করছে।হার্টের ধুকপুকানি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে যেন।লন্ডনের মার্চ মাসের এই হাঁড় কাঁপানো শীতেও তার হাঁসফাঁস লাগতে শুরু করলো।
সে কাচের এপাশ থেকে সরে আসলো।রুমের বাইরে বের হয়ে বিশাল বড় হলরুমে প্রবেশ করলো।হলরুমের একপাশে ফায়ারপ্লেস।তাতে গনগন করে আগুনের লাল শিখা জ্বলছে। আগুনের লাল শিখা জানালার কার্নিশে পড়ে অদ্ভুত সব নকশা তৈরি হচ্ছে। ফায়ারপ্লেসের কাছে ঘেঁষে বসে হাত গরম করছে আগুনের মতোই সুন্দরী একটা মেয়ে।মেঘা তার কাছে গিয়ে হাত নেড়ে বললো,
'গুড মর্নিং শ্রীলা!'
শ্রীলা দুহাত একত্রে করে তালুতে তালু ঘঁষলো।মেঘার দিকে চেয়ে প্রসন্নের হাসি হেসে স্পষ্ট বাংলায় বললো,
'শুভ শুভ্র সকাল মেঘামণি!তোমার আজকের দিন শুভ হোক!'
বিনিময়ে মেঘা মিষ্টি করে হাসলো।শ্রীলা তারই মতো বাঙালি।ভারতের শিলিগুড়ির মেয়ে সে।মেঘা যখন ভার্সিটির ডরমিটরিতে থাকতো সেখানে শ্রীলার সাথে তার পরিচয় হয়।দীর্ঘ আলাপচারিতার পর তারা দুজন এখন আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে।দুজনের বন্ধুত্ব খুবই গভীর।
শ্রীলা মখমলে ঢাকা শরীরে মেঘার পাশে এসে দাঁড়াল।হাতদুটো লং কোটের ভেতর চালান করে বলল,
'মেঘামণি, তুমি কোনো কারণে আপসেট?'
মেঘা সামান্য চমকালো। শ্রীলা তার আর আকাশের ব্যাপারে সব জানে! তবুও একটু ইতস্তত করে বলল,
'আজ তিনদিন হলো আকাশ আমার আমার সাথে যোগাযোগ করছে না। ওর ফোন নাম্বার বন্ধ, মেসেজ করলে প্রতিত্তর আসছে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় যোগাযোগের সব মাধ্যম বন্ধ! মানে ওর সাথে যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা খুঁজে পাচ্ছি না। বাসায় মাকে জিগ্যেস করেছি।মা বিষয়টা এড়িয়ে যাচ্ছে।আমায় সান্ত্বনা দিয়ে বলছে, হয়তো ব্যস্ত। ফোন করবে! কিন্তু শ্রীলা, আমার ভেতরে ভেতরে কেমন অস্থির অস্থির লাগছে। তিন রাত হলো আমি ঘুমাতে পারি না। গতকাল বিকেলে একটু ঘুমিয়েছিলাম। ঘুম ভেঙেছে ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখে।'
মেঘা থামলো। আচমকা শ্রীলার হাত চেপে ধরে অস্থির কন্ঠে বলল,
'শ্রীলা, বলো না আকাশ ঠিক আছে তো? ওর কিছু হয়নি, তাই না? হি ইজ অ্যাবসুলেটলি ফাইন, রাইট?'
মেঘার চোখের কোণে পানি চিকচিক করছে। শ্রীলা তার হাতের উপর হাত রেখে আশ্যস্তের সুরে বলল,
'ইয়াহ! মেঘামণি, আকাশ ভালো আছে। সুস্থ আছে। তার ব্যস্ততা কমলে তোমায় নিশ্চয়ই ফোন দিবে।'
মেঘার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো। স্মিত হেসে সে শ্রীলার গাল টিপে দিল। একটুপর ফায়ারপ্লেসের সামনে গিয়ে বসলো। শ্রীলা স্পষ্ট দেখলো মেঘার মুখের উপর থেকে দুশ্চিন্তার ছাপ অনেকটা কমে গেছে।
শ্রীলা দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে সরে গিয়ে হলরুমের জানালার পাশে দাঁড়াল। জানালার কাচ সরাতে হাঁড়ে কাঁপন ধরানোর মতো শীতল বাতাস ছুঁয়ে দিয়ে গেল। কিন্তু তার কোনো ভাবান্তর হলো না। সুস্থ মস্তিষ্কে মেঘাকে মিথ্যে বলার জন্য ভেতরটা পুড়ে উঠলো তার। সে জানে আকাশের এই ব্যস্ততা কোনোদিন কমবে না, কোনোদিন আর তার মেঘকে ফোন দিবে না। কোনোদিন তার খোঁজ নেবে না। কারণ সে যে আর দুনিয়াতে নেই! এই একই আকাশের সুশীতল ছায়া মাড়িয়ে সে যে অন্য দুনিয়ায় পাড়ি জমিয়েছে!
আকাশের মৃত্যুর খবর তাকে জানানো হয়েছে তিন দিন হলো। অথচ সে এখন পর্যন্ত মেঘাকে বলতে পারেনি। কি করে বলবে? মেঘার সাথে পরিচয়ের পর থেকে বুঝতে পেরেছে আকাশ তার কতখানি জুড়ে আছে। একটা মানুষ তার ভালোবাসার মানুষকে এতটা নিঃস্ব করে, নিজেকে ভেঙে চূড়ে টুকরো টুকরো করে ভালোবাসতে পারে তা এদের দুজনকে না দেখলে তার অজানা থেকে যেত!
মেঘার অগোচরে শ্রীলা চোখের জলটুকু মুছে ফেলল। অসহায় চোখে মেঘার দিকে তাকালো। আজ না হয় কাল! তাকে বলতে হবে,
'মেঘামণি, তোমার মাথার উপরের ভালোবাসার আকাশের মৃত্যু ঘটেছে!তোমায় এখন যে আকাশবিহীন এ ধরায় বেঁচে থাকতে হবে। বেঁচে থাকতে হবে যে!'
*সমাপ্ত*

Comments
Post a Comment