ক্রাশ রোগ

 সুদর্শন এক সাইক্রিয়াটিস্টের সামনে বসে আছে অন্তি। দীর্ঘক্ষণ বাদে শুকনো ঢোক গিলে সে বলল,

'আমার সমস্যা হলো আমি খালি ক্রাশ খাই! ছেলেদের উপর ক্রাশ খাই।'
ডেস্কের এপাশে রকিং চেয়ারে বসে থাকা সাতাশ বছর বয়সী সাফওয়ান স্বাক্ষর চমকে উঠলো। কি সাংঘাতিক কথাবার্তা। সে বড় বড় চোখে অপজিটে বসে থাকা মেয়েটির দিকে তাকালো। ছিপছিপে গড়নের ভারী মিষ্টি একটা মেয়ে। প্রথম দেখায় যে কারো মনে ধরে যাবে। এত সুন্দর একটা মেয়ে মেন্টালি সিক ভেবে কিছুটা মনোক্ষুণ্ণ হলো তার। সে যথাসম্ভব বিনয়ের সহিত প্রশ্ন করলো,
'মিস অন্তি! আপনি কি একা এসেছেন?'
অন্তি মাথা দুলিয়ে অসম্মতি জানাল। মিহি সুরে বলল,
'না একা আসিনি ডক্টর! আমার মামণি এসেছে।'
'এখন কয়টা বাজে বলুন তো।'
'আপনার বাম হাতের ব্ল্যাক কালারের ঘড়ির দিকে তাকান। দেখতে পাবেন। আমি সময় বলার জন্য এখানে এসেছি?'
স্বাক্ষর নড়েচড়ে বসলো। মেয়েটাকে মেন্টালি সিক মনে হচ্ছে না। সঙ্গত কারণে তাকে কথার প্যাঁচে ফেলতে চাচ্ছে। সে ডান হাতের নখ দিয়ে টেবিলে মৃদু শব্দ সৃষ্টি করে বলল,
'মিস অন্তি, মনে করুন আজ থেকে, এই মুহূর্ত থেকে আমি আপনার বন্ধু। সবচেয়ে কাছের বন্ধু। এবার বন্ধু মনে করে আপনার সব সমস্যা আমাকে বলুন তো।'
'আমার কোনো সমস্যা নেই ডক্টর। আমার সমস্যা একটাই। সেটা হলো আমি শুধু ছেলেদের উপরে ক্রাশ খাই। বিষয়টা সমস্যা হতো না যদি আমি একটা ছেলের উপরে ক্রাশ খেতাম। আসলে আমার এই ক্রেজিনেস একটা ছেলের জন্য সীমাবদ্ধ নয়।'
'প্লিজ খুলে বলুন।'
'কি খুলে বলবো?'
স্বাক্ষর দ্বিতীয় বারের মতো থতমত খেয়ে গেল। চোখের মণি এপাশ ওপাশ ঘুরিয়ে বলল,
'আই মিন আপনার সমস্যা সম্পর্কে আরো ডিটেইলসে বলুন। যা জানেন সব বলুন।'
'তাহলে শুরু থেকে বলি। মূলত আমার সমস্যাটা দেখা দেয় ছোটবেলা থেকে। তখন আমি সদ্য ক্লাস ফোরে পড়ি। মার্চ মাসের দিকে আমাদের ক্লাসে একটা ছেলে ট্রান্সফার হয়ে নতুন ভর্তি হলো। গোল গোল চোখের কিউট একটা ছেলে। ছেলেটাকে আমার ভালো লেগে গেল। সবসময় ওর সাথে কথা বলি, একসাথে ঘোরাফেরা করি ইত্যাদি। তখন ক্রাশ জিনিসটা বুঝতাম না! তারপর ক্লাস ফাইভের জানুয়ারির ছুটিতে আমি গাজিপুর গেলাম এক কাজিনের বাসায়। সেখানে কাজিন যে বাসায় ভাড়া থাকে সেই বাড়িওয়ালার ছেলের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠলো। আমরা দুজনেই ক্লাস ফাইভে পড়তাম। ওর সাথে হাসি তামাশা, দৌঁড়ঝাপ করতাম। এক মাস পর স্কুলে এসে বুঝতে পারলাম আমার ওই ট্রান্সফারকৃত নতুন ছেলেটিকে আর ভালো লাগে না। সবসময় শুধু বাড়িওয়ালার ছেলের কথা মনে পড়তো। খুব মিস করতাম তাকে!
এরপর হাইস্কুলে উঠলাম। প্রথম দিন স্কুলে যেতেই আমাকে দেখে শ্যামবর্ণের লম্বা একটা ছেলে গান ধরলো। 'ইটস অা হান্ড্রেড পার্সেন্ট লাভ লাভ লাভ!' ব্যস গান শুনেই ছেলেটার উপর ক্রাশ খেলাম। আমার এই ভালো লাগা এক বছর স্থায়ী হলো। সেভেনে যেখানে কোচিং শুরু করি সেখানকার এক সিনিয়রকে ভালো লেগে গেল। বৃষ্টির দিনে কোচিং গেইটের সামনে পড়ে গেছিলাম, সেটা দেখে সিনিয়র ভাইয়াটা হেসেছিল। সেই হাসির প্রেমে পড়ে গেলাম আমি। তাকে নিয়ে হাজারো জল্পনা কল্পনা শুরু করে দিলাম। এই প্রেমেরও স্থায়িত্বকাল এক বছর কয়েক মাস। ক্লাস এইটে উঠার পর স্কুলের হেড টিচার চেঞ্জ হলো। টাকলা মাথার নতুন এক স্যার এলো। সেই সাথে এলো স্যারের ক্লাস এইট পড়ুয়া ছেলে। দুদিন যেতে না যেতেই সেই ছেলের উপর ক্রাশ খেলাম। তাকে নিয়ে কল্পনায় বার্ধক্যের শহর দেখলাম আরো কত কি! ঠিক নাইনে উঠার পর আর ভালো লাগলো না ছেলেটাকে। আমি তখন আমার এক ক্লাসমেট বন্ধুর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। এটাও এক বছরের বেশি স্থায়ী হলো না। ক্লাস টেনে উঠার পর ক্রাশ খেলাম মামাতো বোনের বিয়েতে গিয়ে। বোনের দেবরের উপর। তাকে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন সাজাতে বসলাম এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম এটাই যেন শেষ ভালো লাগা হয়। কিন্তু প্রতিজ্ঞা টিকলো ঠিক পরের বছর কম্পিউটার স্যারের সাথে দেখা না হওয়া পর্যন্ত।
২০১৭ সালে এসএসসি শেষে আমি কম্পিউটার কোর্সে ভর্তি হলাম। প্রথম দিনই স্যারের কন্ঠের উপর ক্রাশ খেলাম। তারপর তাকে নিয়ে নতুন করে কল্পনার শহর বুনতে লাগলাম। কিন্তু সেটাও বেশিদিন টিকলো না। কলেজের প্রথম বর্ষে হোস্টেলে উঠে যাওয়ার পর ক্রাশ খেলাম সামনের ফ্ল্যাটের এক ছেলের উপর। পরিবার নিয়ে থাকতো ছেলেটা। মাঝে মধ্যে জানালা দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারলে একটু দেখা যেত। তাকে নিয়ে কত স্বপ্ন আমার! বিয়ে করবো দুজন, কিভাবে সংসার করবো, কতগুলো বাচ্চা নিবো মনে মনে সব ভাবা শেষ আমার। ইতোমধ্যে সেকেন্ড ইয়ারে উঠে গেছি। হঠাৎ করে প্রাণীবিজ্ঞান ক্লাসে দেখি সুদর্শন এক স্যার। ঠোঁটের কোণে অনবরত হাসি ঝুলিয়ে রাখা। ব্যস! আমার হোস্টেলের সামনের ফ্ল্যাটের ছেলে মাথা থেকে হাওয়া হয়ে গেল। নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম সদ্য ভার্সিটি শেষ করা স্যারকে ঘিরে। কিন্তু এটাও এক বছর স্থায়ী হলো। এইচএসসি পরীক্ষা শেষে ভর্তি কোচিং-এ গিয়ে দেখি ছেলেদের বহর। যারে দেখি তারেই ভাল্লাগে। মানে কি যে সমস্যায় পড়লাম! এর মধ্যে সবচেয়ে ভালো লাগলো কোচিং এর নিচ তলার ক্যান্টিনের ভাইয়াটাকে! আমি ওনাকে দেখার জন্য দিনের মধ্যে কুড়িবার দোকানে যেতাম। এক পর্যায়ে রুমের সব মেয়ের প্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিস কেনার অজুহাতে দোকানে চলে যেতাম।
এর মধ্যে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলাম। প্রথম দিন ভার্সিটিতে ঢুকতে বিএনসিসির এক ভাইয়ার উপর ক্রাশ খেলাম। তার ডিপার্টমেন্ট খুঁজে বের করলাম। এক বছর লুকিয়ে ঝুঁকিয়ে দেখলাম। বিপত্তি ঘটলো ২০২০ এ এসে। তখন আবার নতুন করে আমার ডিপার্টমেন্টের সিআর কে ভালো লেগে গেল। যেন তেন ভালো লাগা নয়। রাতদিন তার কথা ভাবি। তাকে নিয়ে কল্পনায় হেঁটে হেঁটে সমস্ত পৃথিবী ঘোরা শেষ করি। কিন্তু ২০২০ এর শেষের দিকে এসে বুঝতে পারি আমার আর সিআরকে তেমন মনে ধরছে না। ইতোমধ্যে আমি গবেষণা করে বুঝতে পেরেছি যে আমার এই ভালো লাগার সময় সীমা এক বছরের উপরে যায় না। প্রতি বছর আমার কাউরে না কাউরে ভালো লাগবেই! এবার বুদ্ধি করে ২০২১ সালে আমি সম্পূর্ণ বাইরে বের হওয়া বন্ধ করেছি। সোশ্যাল মিডিয়া, আত্মীয় বাড়ি সব থেকে নিজেকে দূরে রেখেছি। মোট কথা, ২০২১ এ আমি ক্রাশ খাওয়ার ভয়ে একটা ছেলের মুখ দর্শন করিনি। বুঝতে পেরেছেন আমার সমস্যা? আমি ভয়ানক চিন্তায় আছি! আমি সুস্থ না! আমি নিজেকে ঘরবন্দী করেছি বলে বাবা-মা খু্ই চিন্তিত। জোর করে সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে এসেছে। সারাটা পথ আমি গাড়িতে চোখ বন্ধ করে থেকেছি ক্রাশ খাওয়ার ভয়ে।'
স্বাক্ষর কোমায়িত। তার এতগুলো দিনের অভিজ্ঞতায় এই প্রথম এত অদ্ভুত রোগের কথা শুনলো। প্রতি বছর বছর ক্রাশ খাওয়ার রোগ। সে চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে গ্লাসে পানি ঢেলে খেল। আরেক গ্লাস পানি এনে অন্তির দিকে বাড়িয়ে দিল। অন্তি বিনাবাক্য ব্যয়ে ঢকঢক করে পানি খেয়ে সম্পূর্ণ গ্লাস খালি করলো। গ্লাসটা ডেক্সের উপর নামিয়ে রেখে ক্লান্ত চোখে স্বাক্ষরের দিকে তাকালো। চোখে চোখ পড়তে দ্রুত অন্য দিকে তাকালো স্বাক্ষর। কথা গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো। কি চিকিৎসা দিবে এই মেয়ের?
সে কোনোরকমে বলল,
'যাদের নিয়ে আপনার এই অনুভূতি, তাদের কখনো জানিয়েছেন?'
'না! সব এক তরফা ছিল। দু একটা মিউচুয়াল ছিল। কিন্তু তাদের ভালোবাসা বা ভালো লাগার তথা বলার আগেই আমি অন্য একজনের উপর ক্রাশ খেয়েছি।'
'ভারী অদ্ভুত!'
হঠাৎ করেই অন্তি ভেউ ভেউ করে কান্না শুরু করে দিল। স্বাক্ষর ব্যস্ত হয়ে চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করল,
'অন্তি? মিস অন্তি! কান্না করছেন কেন? কি হলো আবার? '
অন্তি নাক টেনে বলল,
'যেই ভয়ে ছিলাম সেটাই হলো। আমি আবার ক্রাশ খেয়েছি। নতুন করে আবার ২০২১ সালে ক্রাশ খেলাম।'
'সে কি! কিন্তু আপনি তো বললেন ২০২১ সালে কোনো ছেলের মুখদর্শন করেননি। আমার চেম্বারে আসার পথে চোখ বন্ধ করে এসেছেন! তাহলে ক্রাশ খেলেন কার উপর?'
'আপনার উপর ডক্টর! এই মুহুর্তে আমার মনে হচ্ছে আপনাকে পাশে না পেলে আমি দম বন্ধ হয়ে মারা যাব। আপনার ঘন চুলে হাত বুলিয়ে দিতে না পারলে আমার জীবন অপূর্ণ থেকে যাবে। ঠিক এই মুহুর্তে মনে হচ্ছে আপনাকে নিয়ে আমি বার্ধক্যের শহর দেখতে চাই।'
স্বাক্ষর কথার খেই হারিয়ে ফেলেছে। মনে হচ্ছে নিজেই মানসিক রোগী হয়ে গেছে। সে হাত পা এলিয়ে দিয়ে বিড়বিড় করে কিছু একটা বললো যা নিজের কাছেই অস্পষ্ট। অন্তি নাক টেনে গাল মুছে বলল,
'কিন্তু আমি জানি আমার এই ফিলিংস এক বছরের জন্য। এক বছর পরে আবার অাপনাকে রেখে অন্য একজনের উপর ক্রাশ খাব।'
স্বাক্ষর অগোছালো দৃষ্টি মেলে অন্তির দিকে তাকালো। কিছুক্ষণ কান্না করেই মেয়েটার নাক লাল হয়ে গেছে। চোখের নিচে ফুলে গেছে। কাজল ল্যাপ্টে গেছে। স্নিগ্ধ ঠোঁট যুগল শুষ্ক হয়ে গেছে। সে কেমন ঘোরের মধ্যে চলে গেল। মেয়েটার ক্রাশ খাওয়ার রোগ কি তার মধ্যে স্থানান্তর হলো? অহ গড! তার চাহনিরহ অবস্থায় অন্তি ভেজা দৃষ্টি মেলে চোখে চোখ রাখলো। সঙ্গে সঙ্গে স্বাক্ষরের বুকের ভেতর কয়েকটা হার্টবিট মিস হলো। সে তড়িঘড়ি করে অন্তির হাত চেপে ধরে বলল,
'অন্তি। তোমার এই রোগের একমাত্র চিকিৎসা হলো ঠিক এই মুহূর্তে যার উপর ক্রাশ খেয়েছ তাকে বিয়ে করা! বিয়ে না করা পর্যন্ত তোমার এই রোগ সাড়বে না। চলো! দু-একদিনের মধ্যে বিয়ে করবো দুজন।'
স্বাক্ষর আর অন্তির বিয়ের বহু বছর হয়ে গেছে। দুটো ছেলে সন্তান হয়েছে। তারা একত্রে হাতে হাত রেখে তেত্রিশটা বসন্ত পার করেছে। অন্তির ক্রাশ খাওয়ার রোগটা বিয়ের পরপরই সেরে গেছে। একেবারে নির্মূল হয়নি। তবে সে এখন একটা মানুষের উপরই হাজার বার ক্রাশ খায়! তার ভালোবাসার উপর! তার স্বামীর উপর।

Comments