অপ্রিয় কিংসুক

 ''অপ্রিয়(?) কিংসুক,

আমার একমাত্র অপ্রিয়! কেমন আছো? মন কেমন আছে? আগের মতো অস্থিরতা এখনো আছে? নাকি উদ্ভিদের মতো কিছুটা থিতু হয়ে এসেছ? বড্ড জানতে ইচ্ছে করে।
তোমার মনে আছে কিংসুক? আমাদের প্রথম দেখা? প্রথম স্পর্শ? আমার কিন্তু মনে আছে। কুয়াশাজড়ানো শীতের সকাল। ভার্সিটির মূল ফটকের সামনে হুট করে সেদিন গোলযোগ বেঁধে গেল। দুই পক্ষের হাড্ডা হাড্ডি লড়াইয়ের মাঝে পড়ে গেলাম আমি। কোনোদিকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। চিরভীতু আমি ভয়ে কেঁদে দিয়েছি ততক্ষণে। হুট করে আমার ভেজা দৃষ্টি তোমার কোটরাগত অক্ষিপটে নিবদ্ধ হলো৷ আমার হৃদয়ের ভয়ার্ত কাঁপুনি তুমি টের পেলে যেন। মুহূর্তে তোমার অস্থির অগ্নিমূর্তিতে চিড় ধরলো। জন্ম নিল মায়া। তুমি দুপাশের ভিড় ঠেলে আমার মুখোমুখি দাঁড়ালে। গোলযোগ থেকে হাত চেপে ধরে আমায় টেনে নিয়ে চললে নিরাপদ আশ্রয়ে৷ সেদিন তোমার হাতের স্পর্শে আমার সমস্ত ভয় হাওয়াই মিঠাই এর মতো উবে গিয়েছিল। ভেজা নয়নে মুগ্ধতা নিয়ে আমি তোমায় দেখছিলাম।আর তুমি সন্ত্রস্থ দৃষ্টিতে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছিলে।
কিংসুক, তুমি কি জানো? যেই মুহূর্তে তুমি আমায় আশ্বস্ততার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলে, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে আমি তোমার প্রেমে পড়েছি। তুমি যখন চারপাশে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছিলে আমার তখন মনে হচ্ছিল ঠিক তোমার লম্বা ছায়াটা, তোমার চওড়া বুকটা, তোমার হাতের এই বাঁধনটা আমার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়! মনে হচ্ছিল এই তোমাতেই আমার দীর্ঘ পথের অবসান। তুমিই আমার একমাত্র গন্তব্য! এই তোমার কাছে পৌঁছানোর জন্য আমি এতগুলো বছর পাগলের মতো ছুটেছি। তুমি আমার চিরসত্যি, বাকিসব মিথ্যে। তোমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে আপন মনে হচ্ছিল। ক্ষণিক সময়ের ব্যবধানে তুমি ভেতরে ভরসার এক পাকাপোক্ত স্থান করে নিয়েছিলে। কি অদ্ভুত তাই না?
সেদিনের গোলযোগ থেমে গেল। ভার্সিটির উত্তপ্ত পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে এলো। তুমি পূর্বের মতো রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে। বছর শেষে শহীদ মিনারের পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছটাতে পূর্বের ন্যায় রক্তলাল ফুল ফুটলো। জলিল মামার চায়ের স্টল সরগরম হয়ে গেল। ভার্সিটির আনাচে-কানাচে হৈ-হুল্লোড় আর গান বাজনায় মুখরিত হয়ে গেল। সব আগের মতো হলো। শুধু আগের মতো হতে পারলাম না আমি!
আমি ততদিনে অন্য একজনে ডুব দিয়েছি। ডুব দেওয়ার পর বুঝতে পেরেছি তার সমুদ্রের অতলতা কত! তাকে স্পর্শ করা যায় না। তার অস্থিরমুখী, চঞ্চল সমুদ্রে ভেসে বেড়ানো যায় না। তার সমুদ্রে স্থির হওয়া যায় না। কিংসুক, তোমার অথই সমুদ্রে আমি অবিরত হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। হঠাৎ একদিন তুমি হাস্যোজ্জ্বল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালে। কি ভেবে যেন দূর থেকেই মুচকি হাসি উপহার দিলে। তোমার সেই হাসিটুকু তলহীন অথই সমুদ্রে এক খন্ড ভাসমান কাঠের টুকরোর মতো কাজ করলো। বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ভেবে সেটাকে আঁকড়ে ধরলাম। কিন্তু যেইমাত্র সেটাকে আঁকড়ে ধরেছি সেই মাত্র একটা ভয়াবহ ধর্মের ঢেউ এসে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল৷ অচেনা, অজানা পথে৷ যে পথ কখনো তোমার সমুদ্রে পড়ে না! তোমার সমুদ্র যাকে তিল পরিমাণ ঠাঁই দেয় না। তোমার সমুদ্রের থেকে সে পথ উল্টো দিকে। সেদিন থেকে আমার সম্পূর্ণ আমি নতুন করে পুড়তে শুরু করলো। পুড়তে পুড়তে নিঃশেষ হওয়ার উপক্রম।
কিংসুক! যতই দিন যাচ্ছিল ততই আমি তোমার প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ছিলাম। আমাদের ধর্ম যে আলাদা, তুমি যে কখনো আমার হবে না, তুমি যে কৃষ্ণচূড়ার মতো বিশালদেহী গাছের মগডালে রঙ ছিটিয়ে হাসবে যা আমি কখনো স্পর্শ করতে পারবো না সব বুঝতাম! তবুও তোমাকে ভালোবাসা থেকে নিজেকে আটকাতে পারিনি। এতে আমার দোষ কোথায় বলো? সেই তোমায় মাথায় নিয়ে আমি ঘুমাতে যাই, সেই তোমায় মাথায় নিয়ে আমার ঘুম ভাঙে।
কিংসুক। তোমার ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। দিন-রাত এক করে পড়াশোনা করছো। তোমায় এখন সেই হাস্যবদনে দলের নেতৃত্ব দিতে দেখা যায় না। সেই অস্থির চিত্তের ভার্সিটি দাপিয়ে বেড়ানো তুমি টা আর চোখে পড়ে না। কিছুদিন পর ভার্সিটি থেকে চির বিদায় নিবে। তখন তোমাকে রাত আটটায় আর চায়ের দোকানেও দেখতে পাব না। শুধু তোমায় দেখার অজুহাতে আমার আর কাপের পর কাপ চা পান করা হবে না! মাঝে মাঝে আমার এটেনডেন্সের ঘরগুলো হয়তো ফাঁকা রয়ে যাবে। নিয়ম করে আর ভার্সিটি যাওয়া হবে না। কখনো বা হয়তো নিঃসঙ্গ সন্ধ্যাবেলায় শহীদ মিনারের পাশে বসে তোমার স্মৃতিচারণে ব্যস্ত হয়ে পড়বো।
জানো! সেদিন দুপুরবেলা তোমার পাশে একটা মেয়েকে হাঁটতে দেখলাম। আমার চাহনিরত অবস্থায় মেয়েটা হাসতে হাসতে তোমার ডান হাত চেপে ধরলো। ঠিক সেই হাতটা, যেই হাতটাকে আমি নিজের অজান্তে একমাত্র ভরসার স্থান করে নিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি তো আগে থেকে অন্য কারো ভরসার স্থান ছিলে! জানো, বিষয়টা জানতাম আমি। কিন্তু মানতে খুব কষ্ট হতো। তোমার স্বপ্নে অন্য কারো আনাগোনা জেনেও আমার স্বপ্ন থেকে তোমায় দূরে রাখতে পারতাম না! তুমি যে আমার চিরসত্য, অম্লান, অনবদ্য।
আমার অপ্রিয়(?) কিংসুক। তুমি আমার কাছে রাতের শেষ প্রহরের মতো সুন্দর। আমার নির্ঘুম হৃদয়ের উত্তাপ মোচনকারী। হৃদরক্তে ছলকে উঠা হাহাকারের একমাত্র প্রতিষেধক। আমার শেষরাতের আকুতির রুদ্ধ দ্বার। আমার হাজারো না পাওয়ার ভিড়ে প্রকম্পিত অভিভাষণ। নতুন এক ঐশ্বরিক দিগন্তের সূচনা। তুমি আমার কাছে রাতের শেষ প্রহরের মতো প্রশান্তির সুধা। নিরব, নিস্তব্ধ, নিরবিচ্ছিন্ন প্রকৃতির শীতল ছায়া!
প্রায়ই মধ্যরাতে আমার দীর্ঘশ্বাস গুলো মাতোয়ারা হয়ে রক্তজবার মতো প্রস্ফুটিত হয়! বুকের গহীনে দহনের উত্তাপ টের পাই। অন্ধকার থেকে লক্ষ কোটি জীবাণু আমায় আক্রমণ করে। রাতব্যাপী পরজীবির মতো দেহে কুটকুট করে কামড়ায়। সেকি আমরণ যন্ত্রণা! ভেতর থেকে অস্থিরতা গলায় কাঁটার মতো বিঁধে। ক্রমেই সেটা বড় হতে থাকে। একটা সময় দম বন্ধ হয়ে আসে। একটুখানি বিশুদ্ধ অক্সিজেন গ্রহণের জন্য আমি ছটফট করতে থাকি।
ঠিক তখন চোখের সামনে তোমার হাস্যরত মুখটি ভেসে উঠে। হাত বাড়িয়ে তুমি যেন আমায় নীল রঙা চাঁদ দেখার হাতছানি দিচ্ছো। কাকচক্ষু নদীতে এক সমুদ্র মায়া নিয়ে শুভ্র মেঘের ভেলা ভাসাতে চাইছো। অকস্মাৎ আমার মুহূর্তগুলো থমকে যায়। ধীরে ধীরে উপলব্ধি করি, আমার শ্বাস স্বাভাবিক হয়েছে। বুকের গহীনের দহনে প্রাণস্পর্শ করেছে। পরজীবি বেঁচে থাকার অন্য মাধ্যম খুঁজে নিয়েছে। বুঝতে পারি ভেতরের অস্থিরতার জায়গায় তুমি স্থান করে নিয়েছ। তৎক্ষনাৎ আমার ওষ্ঠে হাসি ফুটে উঠে। অন্য ভুবন থেকে প্রেমময় হাওয়া এসে দোলা দিয়ে যায়। তখন রাতের শেষ প্রহরের মতো কেমন সুখ সুখ অনুভব করি। হ্যাঁ, সর্বক্ষণের প্রিয় হয়েও অপ্রিয় আমার! তুমি আমার কাছে শেষ রাতের নিশ্চুপ শহরের মতোই সুন্দর। রাতের শেষ প্রহরের এক টুকরো প্রশান্তি!
শুধু তোমার ভাবনায় নিমগ্ন হয়ে আমি অস্থিরতা লুকাই। কিংসুক তোমায় ভুলতে পারবো কি না জানি না! তবে শীতের সকালের সেই তোমার উষ্ণ স্পর্শ আমি কোনোদিন ভুলবো না। তোমার সেই শক্ত সামর্থ্য, বলিষ্ঠ হাতের ছোঁয়া আমি কোনোদিন ভুলবো না। সেদিন প্রথম দেখায় তোমায় আমার শেষ গন্তব্য ভেবেছিলাম। কিন্তু তুমি হয়তো আমার শেষ গন্তব্য নয়৷ আবার আমাকে ছুটে চলতে হবে। এই ছুটে চলা পথের বাঁকে হয়তো নতুন কারো সাথে পরিচয় হবে। কোনো নতুন মানুষ অবলীলায় আমার হাত আঁকড়ে ধরবে। তুমি বলো তো কিংসুক! তাকে কি আমি তোমার মতো করে ভালোবাসতে পারবো? তার স্পর্শ কি হৃদয়ে সেই তোমার মতো একই অনুভূতির সৃষ্টি করবে? তাকে কি নিজের শেষ গন্তব্য ভাবতে পারবো?
কিংসুক। তুমি ভালো থেকো। আমি এতদিনে বুঝতে পেরেছি, দুটো মানুষ নিজেদের শেষ গন্তব্য যখন একে-অপরের মাঝে খুঁজে পায় ঠিক তখন তাদের মিল হয়। তাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পায়। আমার শেষ গন্তব্য তোমাতে খুঁজে পেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার শেষ গন্তব্য ছিল অন্য কেউ! সেজন্য তুমি আমার হলে না। একটা কথা বলি? আস্তো 'তুমি' টা আমার হলে আমি জীবনে আর কিচ্ছু চাইতাম না। কসম! কিচ্ছু না মানে কিচ্ছু না! আজ ইতি টানলাম। অন্য কারো গন্তব্যে সর্বদা ভালো থেকো।
-তায়্যিবা ''
#অপ্রিয়(?)_কিংসুক
#লেখনীতেঃ অজান্তা অহি


Comments