প্যারাসিটামল
হোস্টেলের বান্ধবীকে কে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছি। সেখানে প্রথম ছেলেটার সাথে দেখা। সবুজ রঙের টিশার্ট গায়ের ছিপছিপে গড়নের এক ছেলে। মাথায় ক্যাপ পরিহিত ছিল। ক্যাপের নিচ দিয়ে তার বড় বড় দুটো দৃষ্টি আমার উপরই নিবদ্ধ ছিল। এমনকি চোখের ঘন পল্লব দূর থেকেও স্পষ্ট দেখতে পেলাম। ঘন পল্লবরাশির মাঝে কেমন মোহনীয় সে দৃষ্টি। প্রথম বার চোখে চোখ পড়তে সে ভীষণ লজ্জা পেল! দ্রুত মাথা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিল। আমি কিন্তু মুখ ঘুরিয়ে নিলাম না। কেমন অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। কয়েক মিনিট পরে ছেলেটা ফের আমার দিকে তাকালো। দ্বিতীয় বারের মতো আমাদের দৃষ্টি এক হলো। আমি এখনো তার পানে চেয়ে আছি বলে তার বড় বড় চোখ দুটো আয়তনে আরো বেড়ে গেল। কেমন হতবিহ্বল চোখে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর সেই আগের মতো লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।
আমার বুকের ভেতর থেকে একটা দূষিত শ্বাস বের হলো। চোখ সরিয়ে নিলাম। ইতোমধ্যে বান্ধবীর ডাক পড়লো। সে ডাক্তারের চেম্বারে চলে গেল। লাঞ্চ টাইম! ওয়েটিং রুমে তখন গুটিকয়েক মানুষ। তার মধ্যে আমি আর সেই ক্যাপ পরিহিত ছেলেটিও আছি। কেন জানি তার দিকে আর চোখ তুলে তাকাতে পারলাম না। দেহে এক ধরনের আলস্য এসে ভর করলো। চোখজুড়ে নেমে এলো গভীর বিষণ্ণতা। বুকের কোথাও যেন নিভু নিভু আগুন জ্বলতে লাগলো।
'আপনি কি অসুস্থ?'
ভয়মেশানো কন্ঠ কানে যেতে আমি চোখ তুলে তাকালাম। ছেলেটা আমার পাশের চেয়ারে এসে বসেছে। তার লাজুক চাহনিতে স্পষ্ট আমার জন্য অনুভূতি ফুটে উঠেছে। অদৃশ্য দৃষ্টি দিয়ে তার সব অনুভূতি বুঝতে পারছি। সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতর ঠান্ডা এক স্রোত বয়ে গেল। ছেলেটার সমস্ত ভয় এসে আমাকে জেঁকে ধরলো। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম,
'আমি না! আমার বান্ধবী অসুস্থ। ওর সাথে এসেছি।'
'ওহ! নাম কি আপনার?'
'নূপুর!'
আমি চুপচাপ তার পরবর্তী প্রশ্নের অপেক্ষায় রইলাম। কিন্তু ছেলেটা আর প্রশ্ন করলো না। আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম তার হাতের আঙুলগুলো ক্রমাগত কাঁপছে। তার ভেতরটা যে মৃগী রোগীর মতো ছটফট করছে সেটা ভাবতে কেন জানি আমার ভয় উবে গেল। প্রচন্ড হাসি পেয়ে গেল। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফিক করে হেসে দিলাম। আমার সেই হাসির শব্দে যে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে তাকালো। সন্দেহ নিয়ে বলল,
'হাসছেন কেন? ভুল কিছু বলেছি?'
'উঁহু! আপনি হসপিটালে কেন এসেছেন?'
'ঘুরতে।'
'হসপিটালে কেউ ঘুরতে আসে? ফিনাইলের গন্ধে দম বন্ধ লাগে না? অস্থির লাগে না?'
'না। ছোটবেলা তিন মাসের মতো দীর্ঘ একটা সময় হসপিটালে থাকতে হয়েছিল। সেই থেকে হসপিটালের সাথে কেমন আত্মিক একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। টানা কয়েকদিন হসপিটাল না দেখলে, ফিনাইলের গন্ধ না শুঁকলে অস্থির লাগে। দম বন্ধ হয়ে আসে। সেজন্য রাত-দিন, যখন তখন হসপিটালে চলে আসি।'
আমি অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালাম। কিছু একটা বলতে যাব ঠিক তক্ষুণি আমার বান্ধবী আশা ডাক দিল। আমি ইশারা করতে সে এগিয়ে এলো। আমাকে কিছু বলার সুযোগ দিল না। টানতে টানতে বাইরে নিয়ে গেল। বর্হিগমন গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আশার অসুস্থতার কথা শুনলাম। জটিল কিছু নয় বলে স্বস্তি পেলাম। প্রেসক্রিপশন হাতে নেড়েচেড়ে দেখলাম। কিন্তু আমার মনটা ঘুরেফিরে সেই বড় বড় চোখের মানুষটিকে আরেক নজর দেখার প্রত্যাশায় রইলো। আড়চোখে চারপাশে নজর বুলিয়ে ব্যর্থ হলাম। সেই সবুজ টিশার্ট নজরে এলো না।
কিছুক্ষণ ঘুরে আধঘন্টা পর আমরা হাসপাতালের পাশের ফার্মেসীর দোকানে গেলাম। ডক্টরের প্রেসক্রাইব করা সব ওষুধ নিয়ে নিলাম। টাকা দিতে যাব ঠিক তখন আমার পাশ থেকে একজন বলে উঠলো,
'এক পাতা প্যারাসিটামল, প্লিজ!'
চমকে ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকালাম। দেখি সবুজ টিশার্টের সেই ছেলেটা। এখন মাথায় ক্যাপ নেই। তীব্র কৃষ্ণকায় একগুচ্ছ চুল কপাল জুড়ে ছড়িয়ে আছে। আমি শুকনো ঢোক গিললাম। বান্ধবী তাড়া দিতে হাতের টাকাটা কোনো রকমে বুঝিয়ে দিয়ে উল্টো পথে হাঁটা ধরলাম। আর পেছন ঘুরে তাকালাম না।
________________
এরপর প্রায় একমাস কেটে গেছে। এ সময়টাতে অনেককিছু পরিবর্তন হয়েছে। সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন হয়েছে আমার নিজের মধ্যে। শরীর শুকিয়ে পোড়াকাঠ হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি জমেছে। ত্বকের রঙ অনুজ্জ্বল হয়ে গেছে। ভয়ঙ্কর দশা হয়েছে আমার। রাতের পর রাত ঘুম হয় না। সেদিনের সেই বড় বড় চোখের সর্বনাশা ছেলেটি আমার ঘুম হরণ করে নিয়েছে। আমার মনের দখলদারিত্ব নিয়ে নিয়েছে। তাকে আমি এক সেকেন্ডের জন্য মন থেকে সরাতে পারি না। মস্তিষ্ক থেকে বের করতে পারি না। সারাক্ষণ মাথার মধ্যে দৌঁড় ঝাপ পারে। তার সেই অনুভূতিপূর্ণ চাহনি প্রতি মুহুর্তে আমার ভেতর তুফান সৃষ্টি করে। আমার নির্ঘুম রাতগুলো শুধু তার কথা ভাবে। আমার অস্থির মন আর একটিবারের জন্য তার দেখা পেতে চায়। তার সান্নিধ্যে আসতে চায়।
আমার ভেতরে প্রেমের দাবদাহ সৃষ্টি করা সেই মানুষটার সাথে কিন্তু আর দেখা হয়নি। গত একমাসে আমি প্রতি সপ্তাহে দু বার করে হসপিটালে গিয়েছি। সেই ফার্মেসীর দোকানের আশপাশে ঘুরঘুর করেছি। কিন্তু তার দেখে মেলেনি। আমার গোছানো, পরিপাটি আমি কে অগোছালো করে দিয়ে, ভেঙ্গে চূড়ে এলোমেলো করে দিয়ে সে চিরতরে হারিয়ে গেছে। সে রোজ স্বপ্নে আসে। কিন্তু বাস্তবে তার দেখা মিলে না।
____________
বৃহস্পতিবারের বিকেল। শহরের বুকে আলোকরশ্মি কমে এসেছে। সূর্য পশ্চিম কোণে ডুবি ডুবি করে ডুবছে না। পশ্চিমের আকাশ রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। সেখান থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমি হসপিটালে ঢুকলাম। ওয়েটিং রুমের সেই আসনটাতে গিয়ে বসলাম। দৃষ্টি ফ্লোরে নিবদ্ধ করে মনে মনে প্রার্থণা করলাম। আজ যেন অন্তত এক পলকের জন্য তার দেখা মেলে! পরক্ষণে মনে হলো, তার সাক্ষাৎ পেলে এবার আর আড়াল হতে দিবো না। নিজের কাছে রেখে কঠিন শাস্তি দিবো। কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি!
এরপর কতক্ষণ কেটে গেছে ধারণা নেই। পাশে কেউ বসে পড়তে ফিনাইলের কড়া একটা গন্ধ নাকে ঢুকলো। আচমকা মাথা তুলে পাশে তাকালাম। পরিচিত সেই মুখটি দেখে, বড় বড় চোখ দুটো দেখে কেমন অবিশ্রান্ত অনুভব করলাম। সময় থমকে গেল। বুকের উত্তাল সমুদ্র থিতু হয়ে এলো। অপলক চেয়ে রইলাম। দু চোখ আসতে আসতে ঝাপসা হয়ে এলো। বহু অপেক্ষার দেহটা ক্লান্ত হয়ে গেল যেন। তার চোখের দৃষ্টি আজও প্রমাণ করে দিচ্ছে, তার প্রতি শুধু আমার অধিকার। আর দেরি করলাম না। কন্ঠে স্পষ্ট অধিকার ফুটিয়ে বললাম,
'এতদিন কোথায় ছিলেন আপনি?'
ছেলেটি অমায়িক হাসি উপহার দিল। শুধাল,
'মিস করছিলেন বুঝি?'
চোখের পাতা ফেলতে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। ঝাপসা হওয়া দৃষ্টি প্রখর হতে তার পরণের সাদা এপ্রোন নজরে এলো। বুক পকেটের কাছে সিলভারের উপর লেখা, 'হার্ট সার্জন ড. আর্থিক সজীব' নামটা নজরে এলো। কপাল কুঁচকে এলো আমার। ধুম করে তার বুকে কিল বসিয়ে দিলাম। মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে বললাম,
'মিথ্যে বলেছিলেন কেন সেদিন?'
'আমি মিথ্যা বলি না মেয়ে। আমার ছোটবেলায় বাবা অসুস্থ ছিল। বাবা আমার ভয়ানক দূর্বলতা। তাকে ছাড়া কিচ্ছু বুঝতাম না। তার অসুস্থতার পুরোটা সময় পাশে থেকেছি। কাছাকাছি থেকেছি। তবুও তাকে ধরে রাখতে পারিনি। সেজন্য এই পেশায় আসা।'
আর্থিক থেমে গেল। কিছুক্ষণ পর আমি বিষণ্ণ সুরে বললাম,
'আমিও ভীষণ অসুস্থ। ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না, খেতে পারি না। শ্বাস পর্যন্ত নিতে পারি না। হুট করে একজন হৃদয়দীন, অসচেতন, বজ্জাত ছেলে আমার হৃদয় দখল করে নিয়েছে। সে এমন ভাবে হৃদয়ে বসবাস করেছে যে সম্পূর্ণ হার্ট দূষিত হয়ে গেছে। এটা কেটে ফেলতে হবে।'
'তারপর?'
'তারপর আবার কি? ইমিডিয়েটলি চিকিৎসা প্রয়োজন আমার।'
আর্থিক আমার হাতে এক পাতা প্যারাসিটামল ধরিয়ে দিল। চারপাশে নজর বুলিয়ে একটু কাছে ঘেঁষে বসলো। আমার সমস্ত দুঃখ উড়িয়ে দিতে লাজুক স্বরে বলল,
'আই নিড ইউ লাইক অ্যা হার্ট নিডস অ্যা বিট।'
*সমাপ্ত*

Comments
Post a Comment